মরিয়ম মান্নানের মা আর গুম হওয়া মানুষের কথা

74

মানবতাবিরোধী যত অপরাধ আছে, তার মধ্যে নিষ্ঠুরতম আমার কাছে মনে হয় গুম। মৃত্যুকে একরকম তীব্র গভীর শোকের পর পরিবার একপর্যায়ে মেনে নেয়, শান্ত হয়, সমাধিতে যায়, স্মরণ করে। পরিবার জানে, মানুষটি আর কখনোই ফিরে আসবে না। পরিবারের শিশুরা একদিন বড় হয়। মেনে নিতে শিখে যায়, মৃত মানুষ ফেরে না। যে মানুষটি চলে গেছে, সে আর কখনোই ফিরবে না। কিন্তু গুম হওয়া পরিবারের মানুষগুলো স্রেফ ডুবে যায়; ডুবে যায় অনিশ্চয়তায়, ডুবে যায় আশা–নিরাশার দোলাচলে, ডুবে যায় দোদুল্যমানতায়। অনিশ্চয়তার চেয়ে খারাপ কিছু হয় না। গুম হওয়া মানুষটির স্ত্রী জানে না, সে বিধবা কি না, সন্তান জানে না সে পিতৃহীন কি না, আর তাই বুঝে উঠতে পারে না কী করবে সে। জীবনটা কোন পথে এগোবে।

গুম নিয়ে গত এক যুগে এ দেশে যত আলোচনা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্মের পর তেমনটি আর কখনোই দেখা যায়নি। গুম হওয়া পরিবারগুলোর আর্তনাদ, বিরোধী দলের হইচই, চিৎকার, প্রতিবাদ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, জাতিসংঘের আওয়াজ কিছুই যেন স্পর্শ করে না সরকারকে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান বলে, গত এক দশকে গুমের শিকার হয়েছে ৬০০–র বেশি মানুষ। এ বিষয়ে সরকারের বয়ান খুব স্পষ্ট। ‘ভদ্রলোকের এককথা’র মতো তাদেরও এক বুলি: ‘দেশে গুম বলে কোনো শব্দ নেই, তবে হারিয়ে যাওয়া মানুষ বা মিসিং পারসন থাকতে পারে’।

সর্বশেষ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেতের সফর শেষেও গুম বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য এল সরকারের তরফ থেকে। গুমের বিষয়ে মিশেল ব্যাশেলেতের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের দেশে যেটা হয়, সেটাই আমরা বলেছি। তাদের বলেছি, এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স শব্দ আমাদের দেশে নেই।’ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে গুম নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৭৬টি গুমের যে কথা এসেছে, সেগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে দেখেছে। তাতে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানুষের ‘নিখোঁজ’ হওয়ার কারণ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে তিন কারণে মানুষ ‘নিখোঁজ’ হয়। প্রথমত, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত হওয়ার পর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আত্মগোপনে যায়। দ্বিতীয়ত, কেউ ব্যবসায় লোকসান করলে পালিয়ে থাকে। তৃতীয়ত, পারিবারিক নানা কারণে আত্মগোপন করে।